হাইকিং বা ট্রেকিং নিয়ে আলোচনা

Spread the love

পাহাড়ে ট্রেকিং? জেনে নিন ক্লান্তি দূরে রাখার উপায়

ভ্রমণকারীর সংখ্যাও বেড়েছে অনেকাংশে। সাথে সাথে ভ্রমণের প্রকারভেদও হয়েছে অনেক। কেউ ভ্রমণ করেন শুধু ভ্রমণকারী বা ট্র্যাভেলার হিসাবে, কেউ আবার ট্রেকার, কেউবা হাইকার হিসাবে।

হাইকিং (Hiking) আর ট্রেকিং (Trekking) এখন অতি পরিচিত দুটি শব্দ। আজকাল অনেকেরই হাইকিং বা ট্রেকিং-এর প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। অনেকের মধ্যেই পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। আজ এই পাহাড়, তো কাল ঐ পাহাড়। নিজের সাথেই যেন চলে এক প্রতিযোগিতা। আর যে একবার পাহাড়ে ওঠার স্বাদ পায়, তাকে পাহাড়ের নেশায় পেয়ে যায়। একমাত্র সে-ই জানে, পাহাড়ের ভালোবাসা কেমন।

পাহাড়ে ট্রেকিং এক অনন্য অভিজ্ঞতার নাম। ট্রেকিং মানেই পায়ে হাঁটা দীর্ঘ পথ। সেটা বুনো পথ হোক বা পাহাড়ি পথ ভ্রমণের দিন বা সময় সাধারণত এক দিনের বেশিই হয়। নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে এগিয়ে যান একজন ট্রেকার। তবে পথটা সমতল না হয়ে পাহাড় হলে কষ্টটা বেড়ে যায় অনেক গুণ। অতিমাত্রায় ঘাম, শরীরে পানির অভাব ইত্যাদি থেকে যে কোনো সময় মাসল পুল করা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি ভর করতে পারে শরীরে। জেনে নিন কি করলে ট্রেকিং এর ক্লান্তি কমে আসবে আপনার বহুগুণে। মূলত পথের দূর্গমতার সাথে সাথে ক্লান্তির পেছনে আমাদের ভুলও দায়ী।

ট্রেকিং উপযোগী জুতো:

যে জুতোটা পরে আপনি পার্টিতে যান সেটা তো ট্রেকিং এ পরা যাবেই না, এমনকি যে জুতো পরে অফিসে আসেন বা সকালে হাঁটতে বের হয়ে থাকেন সেটিও পরা যাবে না ট্রেকিং এ যাওয়ার সময়। ভালো গ্রিপ আছে এমন হালকা ওজনের জুতো পরুন। পাশাপাশি জুতোটা যেন দ্রুত শুকিয়ে যায় সে দিকেও খেয়াল রাখুন। এজন্য পানিতে ভিজলে ওজন বেড়ে যায় এধরণের কাপড়ের জুতো এড়িয়ে চলুন।

সঙ্গে রাখুন পানি:

ট্রেকিং এ আপনি সারাক্ষণই ঘামছেন। তাই শরীরের প্রয়োজন পানি। আপনার সাথে পানির একটি বোতল রাখুন। একটু পর পর পানি পান করুন। তবে কখনোই একবারে অনেক পানি পান করবেন না। তাহলে আপনি আরও দুর্বল হয়ে যাবেন, আপনার বসে পড়তে ইচ্ছে করবে। সামান্য পানি বার বার পান করুন।স্যালাইন বা গ্লুকোজ:

পানি তো সাথে রাখবেনই এর সাথে যোগ করুন স্যালাইন বা গ্লুকোজ। সম্ভব হলে দু’টোই সাথে রাখুন। ট্রেকিং এর পথ চেনা পরিচিত হলে অর্থাৎ ঐ পথে আগেও অনেকেই গিয়ে থাকলে তাদের কাছ থেকে পানির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন। স্যালাইন অবশ্যই পানিতে মিশিয়ে খাবেন। তবে গ্লুকোজ না মিশিয়ে খেলেও কাজ করবে। মিশিয়ে খেলে বেশি কাজ করবে। ট্রেকিং এ শরীর পানির অভাব বোধ করে ভীষণ। কিন্তু শুধু পানি শক্তি দেবে না। তাই অবশ্যই ট্রেকিং এর ব্যাগ গোছানোর সময়ই ব্যাগে স্যালাইন এবং গ্লুকোজ নিন।

উপযুক্ত ব্যাগ:

ট্রেকিং এ যাচ্ছেন অথচ ব্যাগ নিলেন বাজারের! হবে তাহলে? আমি শপিং ব্যাগ নিয়েও ট্রেকিং এ আসতে দেখেছি অনেককে। এর চেয়ে বোকামি আর হয় না। আবার সব ব্যাগপ্যাকই ট্রেকিং এর জন্য উপযুক্ত হয় না। অনেক ব্যাগ আছে যাতে অল্প জিনিস নিলেও ভারি হয়ে যায়। এটা হয় ব্যাগের বেল্ট সিস্টেমের কারণে। যেসব ব্যাগে কাঁধের পাশাপাশি কোমরেও বন্ধনী থাকে সেসব ব্যাগে অনেক জিনিস নিলেও শরীরের উপর চাপ কম পড়ে।

প্রয়োজনীয় জিনিসের বাইরে কিছু নয়:

পাহাড়ে ট্রেকিং আমাদের সমতলের মানুষদের জন্য খুব কঠিন একটা কাজ। পাহাড়ি মানুষ হলে যেই পথ খুব দ্রুত পাড়ি দেবে সেই পথই আমাদের পাড়ি দিতে যাবে অনেকটা শ্রম এবং সময়। তাই ব্যাগ গোছানোর সময় অবশ্যই শুধু দরকারি জিনিস নিন। অযথা ব্যাগ ভারি করে কষ্ট বাড়াবেন না। অপ্রয়োজনীয় জিনিস বহন করার আরেকটি সমস্যা হল, প্রয়োজনীয় জিনিসটি বাদ পড়ে যাওয়া। আপনি সখের সানগ্লাস একটির বদলে ৩টি নিলেন আর সানস্ক্রিন নিতে ভুলে গেলেন। এই সমস্যা এড়াতে ট্রেকিং এ ব্যাগ অবশ্যই তালিকা দেখে গোছাতে শুরু করুন।

হালকা কিন্তু ঢাকা পোশাক পড়ুন:

ট্রেকিং এ পোশাক অবশ্যই হালকা রঙের হবে এবং ওজনেও হালকা হবে। সুতি পোশাক পরুন যাতে কাপড়ের মধ্য দিয়ে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে। পাহাড়ে এমন অনেক জায়গা পাবেন যেগুলো এতই খাড়া যে পায়ের সাথে হাতও ব্যাবহার করতে হবে উপরে উঠতে হলে। এমন পোশাক বেছে নিন যাতে পথ যেমনই হোক আপনার পোশাক সেখানে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। ট্রেকিং যেমন রাতে হতে পারে তেমনি দিনেও হতে পারে। রোদ থেকে বাচঁতে সানস্ক্রিন তো অবশ্যই ব্যবহার করবেন, সাথে পোশাকটিও পরুন ফুল হাতা। রোদে হাত-পা, গলার ত্বক পুড়ে যায় যা ক্লান্তিবোধ বাড়ায়।

বিরতি নিন:

প্রতি আধঘন্টার ট্রেকিং এ ২ থেকে ৫ মিনিটের বিরতি নিন। প্রতি ঘন্টায় অন্তত ৭ থেকে ১০ মিনিট বিশ্রাম নিন। আর দুপুর বা রাতের খাবারের বিরতি নিন ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা। চেষ্টা করুন খাবার সময়মত খেতে। অনেক সময় দেখা যায়, খাবার আমরা সাথেই বহন করি কিন্তু নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম না করে খেতে বসি না। খাবারের অভাব আপনার শরীরকে দুর্বল করে দেবে। এতে পরের দিনের ট্রেকিং এ আপনি আরও ক্লান্ত বোধ করবেন। রুটি, পাউরুটি নয়। পুষ্টিকর খাবার যা দ্রুত শক্তি দেয় এমন কিছু খান।

সানগ্লাস, সানস্ক্রিন আর ক্যাপ:

রোদ ট্রেকিং এ আপনার পরম বন্ধু, কারণ বৃষ্টির চেয়ে রোদ ভালো। আবার রোদই আপনার পরম শত্রু। কারণ শরীরের সমস্ত শক্তি সে শুষে নিতে থাকে। তাই ব্যাগে সানগ্লাস, সানস্ক্রিন আর ক্যাপ রাখুন। ক্যাপ না থাকলে গামছা দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিন। সানস্ক্রিন ঘামের কারণে ধুয়ে যায়। তাই যেখানেই পানি পাবেন হাত মুখ ধুয়ে আবার লাগিয়ে নিন।

কিছু জিনিসপত্র সাথে রাখতে হবে মনে করে :– এগুলো হলো-

খুব ভালো একটি আরামদায়ক ও প্রফেশনাল ট্রেকিং বা ক্যাম্পিং ব্যাকপ্যাক, ওডোমস ক্রিম, সান ক্রিম, শুকনো খাবার যেমন- চিড়া, গুড়, ম্যাগি নুডলস, খেজুর; পানির বোতল, লাইটার, চাকু, সানগ্লাস, ক্যাপ, ম্যাপ, কম্পাস, টর্চ লাইট, ম্যাচ বা অন্যান্য আগুন জ্বালানোর উৎস, হুইসেল বা বাঁশি, তাঁবু, জিপিএস, নাইলনের দড়ি, বড় প্লাস্টিক ব্যাগ, আপনার পরিচয় পত্র, টয়লেট টিস্যু ইত্যাদি।

আমাদের দেশে ট্রেকিং এর জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যের একটি হলো কেওক্রাডং পর্বত চূড়া। এছাড়াও অন্যান্য পরিচিত ট্রেইলগুলোর মধ্যে বগালেক, তাজিংডং, পুকুরপাড়া, তিনমাথা, সাজেক ভ্যালি, তিন্ডু, সিপ্পি আরসুয়াং সহ আরো অনেক জনপ্রিয় স্থান রয়েছে। এসব জায়গায় আপনি চাইলেই যেকোনো সময় ট্রেকিং করতে যেতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, ট্রেকিং অবশ্যই দল বেঁধে করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ৩ জনের দল।

ট্রেকিংয়ের সময় বন্য প্রাণীর সম্মুখীন হতে পারেন। হরিণ, সাপ, পাইথন, গেছো বাঘ ইত্যাদির দেখা মিলতে পারে। তবে ঘাবড়ে যাবেন না এবং কোনো ভাবেই এদের কোনো ক্ষতি করবেন না।

প্রকৃতির মাঝে হেঁটে বেড়িয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের যে আনন্দ, সেটির সাথে এই পৃথিবীর অন্যকিছুর তুলনা করা যাবে না। নির্মল বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া, আর পাখ-পাখালির গান শোনা আপনার আত্মাকে শান্তি দেবে। এছাড়াও হাইকিং বা ট্রেকিং আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাবে। হাইকিং বা ট্রেকিং শুধু যে একটি শখ, তা কিন্তু নয়। এটি আমাদের শরীরের জন্যও অনেক উপকারী

সাধারণ এই টিপসগুলো অনুসরণ করুন। দেখবেন, অন্য সময়ের তুলনায় ক্লান্তি নেমে এসেছে অর্ধেকের কোঠায়। পাহাড়ি পথে ক্লান্তি কিছুটা তো থাকবেই। তবে একে নিয়ন্ত্রণ করা বা কমিয়ে আনা কিন্তু আপনারই হাতে। ট্রেকিং এর অভিজ্ঞতা ক্লান্তিকর দুঃস্বপ্নের মতো না হয়ে হোক চিরস্মরণীয় এবং আনন্দের।


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *